রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবন ‘ফিরোজা’ আজ গভীর শোক ও নীরবতায় আচ্ছন্ন। বাড়ির প্রতিটি কক্ষ, আসবাবপত্র, বাগান আর নিরাপত্তা প্রহরীদের অবস্থান—সবকিছু আগের মতোই রয়েছে, কেবল নেই সেই মানুষটি, যাকে ঘিরেই ছিল পুরো বাড়ির প্রাণ।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) গুলশানের ফিরোজার সামনে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ। প্রহরীদের চোখেমুখে বিষণ্নতা, বুকজুড়ে কালো ব্যাজ। বাড়ির ভেতর-বাইরে যেন এক অদৃশ্য শূন্যতা।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসভবন ছিল খালেদা জিয়ার ঠিকানা। তবে এক-এগারোর পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সেখান থেকে উচ্ছেদের শিকার হন তিনি। এরপর থেকেই গুলশানের ‘ফিরোজা’ হয়ে ওঠে তার স্থায়ী আবাস।
২০১৮ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় রায় ঘোষণার দিন এই বাসভবন থেকেই আদালতে গিয়ে সরাসরি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে করোনা মহামারির সময় বিশেষ শর্তে মুক্তি পেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে আবারও ফিরেছিলেন এই ফিরোজাতেই। আজ সেই বাড়ির ফটকে নিরাপত্তা থাকলেও, নেই পরিচিত কণ্ঠস্বর, নেই স্নেহভরা উপস্থিতি।
বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর (সিএসএফ) এক সদস্য অশ্রুসজল চোখে বলেন, “ম্যাডাম আমাদের পরিবারের মতো দেখতেন। ঠিকমতো খেয়েছি কি না, সব সময় খোঁজ নিতেন। আজ তিনি নেই—পুরো বাড়িটাই যেন শুন্য হয়ে গেছে।”
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, “এই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি কোণে ম্যাডামের স্মৃতি লেগে আছে। যারা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে উনার সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ফিরোজার পরতে পরতে এখনো উনার উপস্থিতি অনুভব করি।”
ফিরোজার পাশের ১৯৬ নম্বর বাড়িটি ১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তার পরিবারের জন্য বরাদ্দ দিয়েছিল বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকার। সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান সেই বাড়ির দলিল খালেদা জিয়ার হাতে তুলে দেন। বর্তমানে সেখানে অবস্থান করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
মায়ের মৃত্যুতে তারেক রহমান দিনভর ইবাদত-বন্দেগি, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ায় সময় কাটাচ্ছেন। স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দিতে এলে তিনি আবেগ ধরে রাখতে পারছেন না, মায়ের নানা স্মৃতির কথা স্মরণ করছেন।
কূটনৈতিক এলাকা হওয়ায় গুলশানে জনসমাগম সীমিত থাকলেও স্থানীয় অনেক বাসিন্দাকে ফিরোজার সামনে এসে নীরবে শোক প্রকাশ করতে দেখা গেছে। গুলশানের বাসিন্দা হাসানুজ্জামান খান বলেন, “এই শোক শুধু একটি পরিবারের নয়, গণতন্ত্রপ্রিয় বাংলাদেশের মানুষের শোক।”
এদিকে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়েও শোকের আবহ। কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে, জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। খোলা হয়েছে শোক বই, যেখানে আজ স্বাক্ষর করেছেন সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুর্শিদ, যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জেকবসন, ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর চাভুশি, ছারছীনা দরবার শরীফের পীর মাওলানা শাহ আবু নছর নেছার উদ্দিন আহমেদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
কার্যালয়ের বাইরে নেতাকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। নেতাকর্মীরা বলছেন, চেয়ারপারসনের শূন্যতা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়, তবে তার জনপ্রিয়তার ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনন্য হয়ে থাকবে।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার ভোরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। পরদিন বুধবার মানিক মিয়া এভিনিউতে জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে জিয়া উদ্যানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।